জেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঢোলবাদক, কিংবদন্তি লোকশিল্পী ও সুরসাধক ওস্তাদ বিনয়বাঁশী জলদাসের ১১৫তম জন্মদিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। জন্মভিটায় শ্রদ্ধাঞ্জলি, আলোচনা সভা, গুণীজন সংবর্ধনা, ‘বিনয়বাঁশী অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয় এই কিংবদন্তি শিল্পীকে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর ২০২৬) বোয়ালখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব গোমদণ্ডীর ছন্দারিয়া গ্রামে শিল্পীর জন্মস্থান ও বাস্তুভিটায় বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠীর উদ্যোগে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
১৯০৯ সালে জন্ম নেওয়া বিনয়বাঁশী জলদাস ঢোলবাদনের নিজস্ব শৈলী, দীর্ঘ সাধনা ও অসাধারণ প্রতিভার মাধ্যমে বাংলা লোকসংস্কৃতিতে অনন্য অবদান রাখেন। যন্ত্রসংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একুশে পদকে ভূষিত হন। তাঁর বাদনশৈলী দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করে।
দিনের কর্মসূচির শুরুতে শিল্পীর প্রতিকৃতি, ভাস্কর্য ও সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি এবং পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। পরে বিকেল ৩টায় শিল্পীর পুত্র আন্তর্জাতিক ঢোলবাদক ও লোকশিল্পী বাবুল জলদাস ও তাঁর সহযোগীদের উদ্বোধনী ঢোলবাদনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন, জন্মদিনের কেক কাটা, আলোচনা সভা, একক ও দলীয় সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, গুণীজন সংবর্ধনা এবং সংগঠনের সদস্যদের ‘বিনয়বাঁশী অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা হয়। বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় অনুষ্ঠানজুড়ে সৃষ্টি হয় প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক আবহ।
বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রানু মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ছিলেন দানশীল ব্যক্তিত্ব ও সাধক ডালিম বড়ুয়া। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বোয়ালখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান ফারুক।
বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার সৈয়দ মুহাম্মদ আয়াজ মাবুদ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ্ব আজিজুল হক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্য মো. শওকত আলম এবং বাংলা টিভির চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান চৌধুরী লোকমান।
সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আজগর, বোয়ালখালী প্রেসক্লাবের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম, বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপি যুবদল প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ বোয়ালখালী শাখার সভাপতি স্বপন শীল, বোয়ালখালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শরৎচন্দ্র বড়ুয়া, শ্রীপুর-খরনদ্বীপ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান হাসান চৌধুরী, রমেশ শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ও শিক্ষক প্রলয় চৌধুরী মুক্তি, বোয়ালখালী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক ইয়াছিন চৌধুরী, সাংবাদিক শাহ আলম বাবলুসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বিনয়বাঁশী জলদাস ছিলেন বাংলার লোকসংগীত ও ঢোলবাদনের এক অনন্য সাধক। তাঁর দীর্ঘ সাধনা, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতার কারণে ঢোলবাদন একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম তুলে ধরার পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
সংগঠনের সদস্য সজীব চৌধুরীর সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব জলদাস। এ সময় সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বকুল বড়ুয়া, সহ-সাধারণ সম্পাদক আশুতোষ দাশ, সহ-কোষাধ্যক্ষ শিক্ষক মাহফুজ রকি, সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ ইউছুপ, সাহিত্য সম্পাদক শিক্ষক প্রদুল কান্তি দে, দপ্তর সম্পাদক ডা. শ্যামাপ্রসাদ দাশগুপ্ত, মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা প্রিয়াংকা দাস, সহ-মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা জয়শ্রী দাসসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য দেন।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশ টেলিভিশন ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী সুকুমার দে, টেলিভিশন ও বেতারের তালিকাভুক্ত সংগীতশিল্পী বিধান দাস, সংগীতশিল্পী কালীপদ দাস, মো. ফারুক, জয়িতা ঘোষ, মিত্রা দে, সৃষ্টি শীল, প্রীতি দাস, মোহিনী দাস, নন্দিনী দাস, অদিতি দাস, পিউ দাস ও জয়শ্রী দাস।
নৃত্য পরিবেশন করেন অর্পিতা ঘোষ, অন্বেষা চৌধুরী ও বর্ষা আচার্য্য। এছাড়া দলীয় ও একক সংগীত পরিবেশন করেন টিংকু রানী দেবী, পায়েল দেবী, পাপড়ি দেবী, কান্তা দেবী, শ্রুতি দেবী, রনি নাথ, শ্রাবণী দে ও পুষ্পা দেবী।
ঢোলবাদনে অংশ নেন মিন্টু দাস, নান্টু দাসসহ অন্যান্য শিল্পী। যন্ত্রানুষঙ্গে ছিলেন অক্টোপ্যাডে শিমুল আচার্য, কিবোর্ডে শিপলু দাস, তবলায় অনিক দাস এবং বাঁশিতে মিঠুন চক্রবর্তী।
অনুষ্ঠানে বিনয়বাঁশী জলদাসের পরিবারের সদস্য, বিনয়বাঁশী শিল্পীগোষ্ঠীর নেতৃবৃন্দ ও সদস্য, শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।