শহিদুল ইসলাম, নানিয়ারচর প্রতিনিধি:
রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরে মাদক, জুয়া, কিশোর গ্যাং, অবৈধ পাহাড় কাটা ও বালু উত্তোলনসহ বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রশাসন ও সেনাবাহিনী। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নদীতে অবৈধ জাল বন্ধ এবং জনদুর্ভোগ লাঘবে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে মাসিক আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় নানিয়ারচর সেনা জোনের পক্ষ থেকে সার্জেন্ট শেখ মুরাদ হোসেইন (এফএস এনসিও), স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিয়ের প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হয়। নানিয়ারচর সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাপ্পি চাকমা সাপমারা ও কুকুরমারা এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বাল্যবিয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। এ বিষয়ে জোন প্রতিনিধি জানান, লিখিত আবেদন পাওয়া গেছে। উপজেলা প্রশাসনের পরামর্শ ও জোন কমান্ডারের নির্দেশনা অনুযায়ী অভিভাবক, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে উঠান বৈঠকসহ সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সভায় পথকুকুরের অসুস্থতা নিয়েও আলোচনা হয়। অসুস্থ ও বেওয়ারিশ প্রাণীর কারণে পরিবেশ দূষণ এবং জলাতঙ্কের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে সেনা জোন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী গৃহপালিত প্রাণীর টিকা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও বেওয়ারিশ প্রাণীর ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।
চেঙ্গী নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ নেট জাল ব্যবহার করে মাছ ধরার বিষয়টিও সভায় গুরুত্ব পায়। জোন প্রতিনিধি জানান, নদীতে এ ধরনের জাল ব্যবহারের কারণে সাধারণ মানুষের নৌ-চলাচলের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটছে। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।
সড়কে গবাদিপশু ছেড়ে দেওয়া বা বেঁধে রাখার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি ঘিলাছড়ি বাজারের হাটের দিনে আরএমএমকে সড়কে দোকানপাট ও যানবাহন রাখার কারণে সৃষ্ট যানজট নিরসনে বাজার পরিচালনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে সড়ক দখলমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় স্থানীয় সাংবাদিক প্রতিনিধিরা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, অনলাইন জুয়া, কিশোর গ্যাং, পাহাড় কাটা, অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাদকের বিস্তার রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সেনা জোনের প্রতিনিধি জানান, অবৈধ পাহাড় কাটা, বালু উত্তোলন ও মাদকের বিরুদ্ধে জোন কমান্ডারের পক্ষ থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য দিয়ে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য তিনি স্থানীয়দের প্রতি আহ্বান জানান।
কিশোর ও যুবসমাজকে অনলাইন বেটিং ও জুয়া থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলায় সম্পৃক্ত করার বিষয়েও সভায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি ‘রাঙ্গামাটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কাপ’ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি ইসলামপুরের ‘ভাই ভাই ক্লাব’ আয়োজিত ফুটবল টুর্নামেন্টেও রেফারি, লাইন্সম্যান ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানানো হয়।
আগামী ১৫ থেকে ২০ অক্টোবর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে উপজেলার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও আলোচনা হয়। নানিয়ারচর কলেজের পক্ষ থেকে পূজামণ্ডপগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হলে সেনা জোনের প্রতিনিধি জানান, পূর্বের মতো এবারও প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ তৎপর থাকবে।
সভায় নানিয়ারচরের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরা হয়। বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে এলাকায় নতুন একজন লাইনম্যান পদায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানানো হয়। এছাড়া ডাকবাংলো পাড়া সাব-স্টেশনের নিরাপত্তার জন্য নিরাপত্তা প্রহরীর একটি কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে।
সাব-স্টেশনে প্রয়োজনীয় পাঁচটি ব্রেকার না থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে বলেও সভায় জানানো হয়। এ সমস্যা সমাধানে জোন কমান্ডারের উদ্যোগে বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং দ্রুত ব্রেকারগুলো এনে স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সভায় নানিয়ারচরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জনদুর্ভোগ কমানো এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগণের সমন্বিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।