পূর্বধলা (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি:
বয়স ৭২ বছর। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ভিক্ষাবৃত্তিই ছিল একমাত্র অবলম্বন। অভাব-অনটন আর অসহায়ত্বের কারণে প্রায় চার বছর ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন আমেনা খাতুন। এবার সেই জীবনে এসেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। ভিক্ষার ঝুলি ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি।
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বিশকাকুনী ইউনিয়নের মধ্যপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি মুদি দোকান। দোকানের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার জন্য সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় আটচল্লিশ হাজার টাকার বিভিন্ন পণ্য।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মধ্যপাড়া গ্রামে আমেনা খাতুনের নতুন দোকানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পূর্বধলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শফিকুল ইসলাম।
অভাবের তাড়নায় ভিক্ষাবৃত্তিতে
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আমেনা খাতুন দুই ছেলে ও এক মেয়ের মা। তাঁর এক ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। অন্য ছেলে খেতমজুরি করে কোনোভাবে সংসার চালান। স্বামী দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় সংসারে নেমে আসে চরম অভাব। বাধ্য হয়ে প্রায় চার বছর আগে ভিক্ষাবৃত্তিতে নামতে হয় আমেনা খাতুনকে।
এরপর প্রায় এক বছর আগে স্বামী মারা গেলে তাঁর জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে ভিক্ষাবৃত্তিই হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান অবলম্বন।
ভিক্ষাবৃত্তি থেকে স্বাবলম্বী হওয়ার উদ্যোগ
আমেনা খাতুনের এমন অসহায় অবস্থার কথা জানতে পেরে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় তাঁকে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় সমাজকল্যাণ পরিষদের অর্থায়নে তাঁর জন্য তৈরি করা হয় একটি মুদি দোকান।
শুধু দোকান তৈরি করেই থেমে থাকেনি উদ্যোগটি। ব্যবসা শুরু করার জন্য দোকানে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যও সরবরাহ করা হয়েছে।
বুধবার দোকান উদ্বোধনের পর আমেনা খাতুনের হাতে এসব মালামাল তুলে দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘদিনের ভিক্ষাবৃত্তির জীবন পেছনে ফেলে এবার নিজের ব্যবসার মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পেলেন তিনি।
অন্যদেরও পুনর্বাসনের উদ্যোগ
দোকান উদ্বোধনকালে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান, বিশকাকুনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম আল আমীনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বাসিন্দারা উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ কর্মসূচির আওতায় আমেনা খাতুনকে দোকান করে দেওয়া হয়েছে। দোকানের প্রয়োজনীয় মালামালও সরবরাহ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দোকান থেকে আয় করে স্বাবলম্বী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার অন্য ভিক্ষুকদেরও বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, উপজেলার ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের আওতায় আনা হবে।
‘এখন থেকে দোকানের আয়েই সংসার চালানোর চেষ্টা করব’
নতুন দোকান পেয়ে আবেগাপ্লুত আমেনা খাতুন উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এখন থেকে দোকানের আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করবেন।
৭২ বছর বয়সে এসে ভিক্ষাবৃত্তির বদলে ব্যবসার নতুন পথ—আমেনা খাতুনের জন্য এটি শুধু একটি দোকান নয়, বরং জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা।